• ঢাকা
  • শনিবার, ২ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • Govt. SL. No:-352

Advertise your products here

করোনা পরবর্তী শিশু শিক্ষা এবং আমাদের করণীয়


ডে-নাইট-নিউজ ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ আগষ্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ০৮:০১ পিএম;
করোনা পরবর্তী শিশু শিক্ষা এবং আমাদের করণীয়
করোনা পরবর্তী শিশু শিক্ষা এবং আমাদের করণীয়

শিক্ষা শিশুদের মৌলিক অধিকার হলেও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে (বিশেষত চরাঞ্চলে) ও শহরাঞ্চলের বস্তিতে সেই অধিকার আজো অনেকাংশে উপেক্ষিত। শিশুরা বেড়ে উঠছে নানা প্রতিবন্ধকতার সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করে৷ নিম্নবিত্ত ও পথশিশুদের দিনাতিপাত হচ্ছে রাস্তায় প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে, কখনো বা স্টেশনে শ্রম বেঁচে। অল্প মজুরিতে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করানো যায় বলে, মালিকেরাও শিশুদের বেশি নিয়োগ দিচ্ছে, কোন নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ৷ শহরাঞ্চলের গ্যারেজ,কারখানা কিংবা বেকারিতে একটু নজর দিলেই দেখা মিলবে হতদরিদ্র শিশুদের, এক রূঢ় বাস্তবতায় দিনাতিপাতের কঠিন চিত্র। .

এই সমাজবাস্তবতায় করোনা মহামারি যেনো আঘাত হানে এক প্রলয়ংকরী ঘূর্নিঝড় রুপে। স্কুল-কলেজ সহ যাবতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় ২০২০ সালের  মার্চের ১৭ তারিখে  ৷ মাত্রই ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠা সৌমিকের মতো হাজারো শিশু-কিশোর বাসায় ঘরবন্দী হয়ে পড়ে৷ মার্চে যখন তার স্কুল বন্ধ হয়ে গেলো, সেই সাথে যেনো তার সুন্দর দিনগুলো ও গেলো অস্তাচলে৷ গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান সৌমিকের বাবার রিকশার চাকা তখন আর চলে না। সাত সদস্যের পরিবারের অন্নের ব্যাবস্থা করতে  উপায়ান্তর না দেখে সৌমিক কে অন্যের জমিতে কাজে লাগিয়ে দিলো তার বাবা৷ এখন পড়াশোনা থেকে অনেকটা দুরে চলে এসেছে সৌমিক। এই শিশু বয়সে, পরিবারের অন্নের যোগান দিতে, সে কাধে  বয়ে চলেছে  রাজ্যের বোঝা ৷ তবে এখনো মাঝে মাঝে গরুর পাল নিয়ে মাঠে যেতে যেতে তার মনে পড়ে,সেই সোনালি দিনগুলোর কথা! যখন সৌমিক পঞ্চম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে তখন সে সরকারি বৃত্তি পেয়েছিলো।   সবাই তার কত তারিফ ই না করেছিলো সেদিন! হেডমাস্টার স্যার নিজে তাদের বাড়িতে এসে সৌমিক কে একটি ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন।  কিন্তু ঐসব দিন এখন শুধুই অতীত।করোনার করাল থাবা  তার সোনালি দিনগুলোর উপন্যাসটা আর বাড়তে দিলো না৷.

এমন সৌমিকের সংখ্যাটা,যেনো করোনার সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রমেই বেড়ে চলেছে৷ ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন মতে, বিশ্বের ১৩০ টি দেশে করোনা মহামারিতে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, বর্তমানে ১০০ কোটির ও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। .

শিশুদের উপর করোনার ভয়াল প্রভাব পরোক্ষভাবেই বেশি পড়েছে৷ করোনায় অনেকের বাবা-মা মৃত্যুবরণ করেছে,আবার অনেকের বাবা-মা হারিয়েছেন চাকরি। ফলে তাদের পরিবারের  জীবনধারণ হয়ে দাড়ায় দুঃসাধ্য!তখন ই শিশুদের নানা কাজে নিয়োজিত করতে বাধ্য হচ্ছে পরিবার৷ এই বিষয়ে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, "সংকটের সময়ে অনেক পরিবারই টিকে থাকার কৌশল হিসেবে শিশু শ্রমকে বেছে নেয়।" যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ আজ আমরা বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান হতে দেখছি। .

করোনা মহামারিতে লাখো শিশু শিক্ষার্থী শিক্ষার আলো থেকে চিরতরে অন্ধকারে চলে গেছে এবং এখনো যাচ্ছে। শিক্ষা তাদের মৌলিক অধিকার হলেও, পরিবারের হাল ধরার জন্য, নিজেদের হালের নিয়ন্ত্রণ তারা হারিয়ে ফেলেছে। শিক্ষার ছায়া থেকে তারা ক্রমশই শতক্রোশ দূরে চলে যাচ্ছে। .

দেশের অদূর ভবিষ্যত, আজকের শিশুরা, যেনো করোনা পরবর্তী সময়ে শিক্ষাগ্রহণ থেকে ঝড়ে না পড়ে,সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা অত্যাবশ্যক-.

১. স্কুল খোলার সাথে সাথে অনুপস্থিত শিশুদের আবারো নিয়মিত স্কুলমুখী করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা৷কমিটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও শিক্ষকদের দ্বারা গঠিত হবে৷ তাদের মূল দায়িত্ব হবে স্কুলের অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের আনয়নের ব্যবস্থা করা। .

২. শিশুদের অল্পতেই মানসিক চাপ অনেক বেড়ে যায়৷ করোনা মহামারিতে স্কুলে যেতে না পারা, বন্দিজীবনে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা ও পরিবারের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।  এজন্য বিদ্যালয় খোলার পর, প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন করে শিশুদের মানসিক ভারসাম্য পুনরায় স্বাভাবিক করতে হবে৷ .

৩. এখনো সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে করোনা সংক্রমণের হার না কমায়৷ এক্ষেত্রে যখনই সংক্রমণের হার কমে আসবে , সরকারি নির্দেশ সাপেক্ষে, অতিসত্বর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া৷ কেননা,যত দেরি হবে, ততই শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়ার হার বাড়তে থাকবে৷ তবে, সেক্ষেত্রে করোনা সংক্রমণ যেনো আবারো না বাড়ে সেক্ষেত্রে, পর্যাপ্ত ব্যাবস্থা রাখার বিষয়টা ও চিন্তা করা অতীব জরুরি।সেক্ষেত্রে, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শিফটে ভাগ করে, ক্লাসের সংখ্যা সীমিত করে ও সম্পূর্ণ সাস্থ্যবিধি পালনপূর্বক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাবস্থা করা উচিত৷ .

করোনা পরবর্তী স্কুল খোলার পর যে দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে তা হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার বৈষম্য। কেননা এই করোনাকালে ইন্টারনেট সুবিধা,পড়াশোনার পরিবেশ, বই পুস্তক কেনার সক্ষমতায় সবাই সমান সুবিধা পায় নি৷ তাই একই স্কুলের, একই শ্রেণীতে পড়েও দুইজনের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে যাবে৷ সেক্ষেত্রে,পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের টেনে তুলতে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এছাড়াও,  করোনাকালীন যে ক্লাসগুলো নেয়া হয়েছে, সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো আবারো সামনাসামনি আলোচনা করলে এই বৈষম্য দূর হবে বলে আশা করা যায়৷ .

এই মহামারিতে কেউ হারিয়েছে তার বাবাকে, কেউ মাকে, কেউবা আবার হারিয়েছে ভাই-বোনকে। ফলে, একদিকে যেমন শোকের মাতম অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকটে স্কুল বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম যে করোনা পরবর্তী সময়ে দেখা দিবে তা একরকম নিশ্চিতভাবেই বলা চলে ৷ সেক্ষেত্রে, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেতন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যেনো কমানোর ব্যবস্থা করা হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।.

আজকের শিশুরাই আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।আমাদের শিশুদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা আমাদেরই দায়িত্ব। তাদের মাধ্যমেই আসবে পরিবর্তন, উন্নত হবে জাতি৷ তাদের এই অধিকার যেনো পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তারা পায় তার ব্যাপারে সবাইকে রাখতে হবে সুতীক্ষ্ম দৃষ্টি। মূলধারার শিক্ষার্থীদের সাথে যেনো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও পার্বত্য অঞ্চলের সকল শিশুও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়,জাতি,ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেনো শিক্ষার আলোতে আলোকিত হয় তার উপর আলোকপাত করা অতীব প্রয়োজন৷ করোনা মহামারি সহ সকল দুর্যোগেও যেনো তারা পথ না হারায় তার জন্য দুর্যোগকালীন সময়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যেনো তাদের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা যায়৷ .

যারা(পূর্ণবয়স্করা)  ইতোমধ্যে বিভিন্ন কাজে ঢুকে পড়েছেন ,তাদের শিক্ষিত করা অনেকটাই দুঃসাধ্য । অর্থাৎ, বর্তমানে শিক্ষার হার ১০০ ভাগে নেয়া অনেকটা অসম্ভব প্রায় ৷উল্লেখ্য, ২০২০ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপমতে, দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪.৭০ শতাংশ৷ কিন্তু, চর ও পথশিশুদের জন্য আলাদা শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে তাদের মূলধারায় নিয়ে আসতে পারলে এবং বর্তমানে সারাদেশের শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমে  ধরে রাখতে পারলে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ শতভাগ শিক্ষিত এক জাতি পাবে৷ যা দেশের সার্বিক উন্নয়নে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা৷ এক্ষেত্রে, আমাদের নিকটবর্তী দেশ চীন একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। তারা তাদের নাগরিকদের ছোট থেকেই কারিগরি শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের হাত ধরেই পুরো বিশ্ব আজ আধুনিকতার ছোয়া পাচ্ছে। চীন তাদের নাগরিকদের সুশিক্ষিত করে আজ পুরো পৃথিবীর সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে৷ যার মূলে রয়েছে তাদের অধিক শিক্ষিত জনশক্তি উৎপাদন।.

করোনা মহামারিতে, শিশুদের শিক্ষার অধিকার সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হচ্ছে৷ দেশের অধিকাংশ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীরাই নিয়মিত অনলাইন ক্লাসের আওতায় আসতে পারে নি। ফলে অল্প বয়সে  তাদের ঝড়ে পড়ার হার অন্য সবার চেয়ে বেশি হতে যাচ্ছে যদি না স্কুল খোলার সাথে সাথে তাদের স্কুলমুখী করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়া হয়৷ করোনা পরবর্তী, শিশু শিক্ষার মহামারি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই হতে পারে উত্তরণের একমাত্র উপায়৷ শিশুদের শিক্ষার সুপরিবেশ নিশ্চিত করাই,  আমাদের আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশের ভিত্তি। . .

ডে-নাইট-নিউজ / আসিফ আলম, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়   

সম্পাদকীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ